চট্টগ্রামের কর্ণফুলী উপজেলায় জুলাই সনদ বাস্তবায়ন, গণভোটের রায় কার্যকর, গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার, সুশাসন ও জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবিতে বিক্ষোভ সমাবেশ ও গণমিছিল করেছে চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা ১১ দলীয় ঐক্য। সমাবেশে বক্তারা দাবি করেন, জুলাই আন্দোলনের চেতনা ও গণভোটের রায় বাস্তবায়নে কোনো ধরনের গড়িমসি মেনে নেওয়া হবে না। একই সঙ্গে তারা বিএনপি সরকারের প্রতি সতর্কবার্তা দিয়ে বলেন, “জুলাই না থাকলে বিএনপিও এ দেশে থাকবে না।”
শনিবার (৪ জুলাই) বিকেল ৫টার দিকে কর্ণফুলী উপজেলার শিকলবাহা কলেজ বাজার থেকে গণমিছিল শুরু হয়ে মইজ্জ্যারটেক চত্বরে গিয়ে শেষ হয়। পরে সেখানে সংক্ষিপ্ত বিক্ষোভ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সমাবেশে বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনের নেতাকর্মীরা অংশ নেন।
সমাবেশে বক্তারা বলেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতা ১৯৭১ সালে অর্জিত হলেও ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের মধ্য দিয়ে সেই স্বাধীনতা নতুন অর্থ ও পূর্ণতা পেয়েছে বলে জনগণের একটি বড় অংশ বিশ্বাস করে। তাই জুলাই আন্দোলনের অর্জনকে উপেক্ষা বা দুর্বল করার যেকোনো প্রচেষ্টা জনগণ মেনে নেবে না।
একজন বক্তা বলেন, “আমরা বিএনপি সরকারকে সহযোগিতা করতে চাই। জনগণের ভোটে তারা সরকার গঠন করেছে এবং আমরা চাই তারা পূর্ণ মেয়াদে দায়িত্ব পালন করুক। কিন্তু জুলাই আন্দোলনের চেতনা ও গণভোটের রায় বাস্তবায়নে যদি কোনো ধরনের তালবাহানা করা হয়, তাহলে দেশের মানুষ আবারও রাজপথে নামবে।”
তিনি আরও বলেন, “১৪০০ শহীদের রক্তের কসম করে বলছি, যদি জুলাই না থাকে, তাহলে বিএনপিও এ দেশে থাকতে পারবে না। জুলাই না থাকলে দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বও প্রশ্নের মুখে পড়বে।”
সমাবেশে বক্তারা অভিযোগ করেন, গণভোটে জনগণের যে রায় এসেছে, তা দ্রুত বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সরকার প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিচ্ছে না। তারা বলেন, জনগণের প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হলে রাজনৈতিক দলগুলোও জনসমর্থন হারাবে।
সমাবেশে জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য অধ্যাপক আহসানুল্লাহ ভুঁইয়া বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থান ছিল বৈষম্যহীন, ন্যায়ভিত্তিক ও ইনসাফপূর্ণ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক আন্দোলন। আওয়ামী লীগের পতন হলেও এখনও সেই প্রত্যাশা পূরণ হয়নি বলে তিনি মন্তব্য করেন।
তিনি বলেন, “বিএনপি আন্দোলনের শরিক ছিল। কিন্তু সরকার গঠনের পর তারা জুলাই সনদ বাস্তবায়নে দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখাতে পারেনি। গণভোটের রায়কে যথাযথ গুরুত্ব না দিলে তারা জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে।”
অধ্যাপক আহসানুল্লাহ ভুঁইয়া আরও বলেন, “নির্বাচনের পর বিএনপির যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তাতে প্রশ্ন জাগে তারা পাঁচ বছর ক্ষমতায় থাকতে পারবে কি না। আওয়ামী লীগের পরিণতি থেকে শিক্ষা নেওয়া উচিত। জনগণের ভাষা ও প্রত্যাশা বুঝতে না পারলে রাজনৈতিক মূল্য দিতে হবে।”
তিনি দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, খুন, হত্যা, ধর্ষণসহ বিভিন্ন অপরাধ বেড়েছে। দ্রুত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
সমাবেশে প্রধান বক্তা হিসেবে বক্তব্য দেন এনসিপির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য জোবাইরুল আলম মানিক। তিনি বলেন, “জনগণ সবসময় অধিকার আদায়ে ঐক্যবদ্ধ থেকেছে। অতীতে স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে মানুষ যেমন আন্দোলন করেছে, ভবিষ্যতেও প্রয়োজন হলে গণতন্ত্র ও জনগণের অধিকার রক্ষায় রাজপথে নামবে।”
তিনি অভিযোগ করেন, গণভোটের রায় বাস্তবায়নে বিলম্ব জনগণের প্রত্যাশার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। একই সঙ্গে জুলাই আন্দোলনের ঘটনায় দায়ীদের বিচার এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিচার দ্রুত সম্পন্ন করার দাবি জানান তিনি।
সমাবেশে আরও বক্তব্য দেন খেলাফত মজলিসের জেলা ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মাওলানা হুমায়ুন আজাদ, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মাওলানা নোমান উদ্দীন, এবি পার্টির জেলা যুগ্ম সম্পাদক ইঞ্জিনিয়ার জায়েদ হাসানসহ ১১ দলীয় ঐক্যের বিভিন্ন নেতা।
জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় মজলিসে শুরা সদস্য ও চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা আমীর আনোয়ারুল আলম চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সমাবেশ সঞ্চালনা করেন জেলা সেক্রেটারি অধ্যক্ষ মাওলানা বদরুল হক। এতে জেলা সমন্বয়ক ও এনসিপি নেতা সাজ্জাদ হোসেন, জেলা জামায়াতের সাংগঠনিক সেক্রেটারি অধ্যাপক মাহমুদুল হাছান, সহকারী সেক্রেটারি মুহাম্মদ জাকারিয়া, অধ্যক্ষ মাওলানা ইসমাইল হক্কানী, মাওলানা আরিফুর রশিদ, আ ক ম ফরিদুল আলমসহ বিভিন্ন দলের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
সমাবেশ শেষে আয়োজকরা বলেন, গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার ও জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবিতে তাদের কর্মসূচি ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে। একই সঙ্গে তারা জুলাই সনদ বাস্তবায়ন, গণভোটের রায় কার্যকর এবং জুলাই আন্দোলনের ঘটনায় অভিযুক্তদের দ্রুত বিচারের দাবি পুনর্ব্যক্ত করেন।
Sarwar Rana