ঢাকা | বঙ্গাব্দ
Netfie
N
মাত্র ৮,৫০০ টাকায় Website থেকে App তৈরি করুন
✓ Play Store Publish Android App Push Notification
যোগাযোগ করুন → 01884-189495

বিলুপ্তির পথে ‘রুপালি’ বৈরালী

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : Jun 20, 2026 ইং
  • পঠিত: ২২ বার
Overlay/Verification


হাসানুজ্জামান হাসান,লালমনিরহাট::

উত্তরাঞ্চলের নদীনির্ভর জনপদের মানুষের কাছে বৈরালী মাছ শুধু একটি সুস্বাদু মাছই নয়, এটি একসময় ছিল জীবিকা, সংস্কৃতি ও খাদ্য নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

রংপুর অঞ্চলে ‘রুপালি মাছ’ নামে পরিচিত এই মাছ ব্রহ্মপুত্র, তিস্তা ও ধরলা নদীর অববাহিকাজুড়ে কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, নীলফামারী, রংপুর ও গাইবান্ধা জেলার মানুষের খাদ্যতালিকায় বিশেষ স্থান দখল করে ছিল।

গেল কয়েক বছরধরে ব্রহ্মপুত্র ও তিস্তা নদীতে আশানুরুপ বৈরালী মাছ মিলছে না। গেল বছর যে পরিমানে এ মাছ পাওয়া গিয়েছিল এবছরেআরো কমেছে। এ অবস্থা চলতে থাকলে আগামী কয়েক বছর পর বৈরালী মাছ দেখাই যাবে না। বিলুপ্তির পথে ‘রুপালী’ বৈরালী মাছ।

মৎস্যজীবি, মাছ বিক্রেতা ও ক্রেতারা জানান, একসময় উত্তরাঞ্চলের নদ-নদীগুলোতে ঝাঁকে ঝাঁকে বৈরালী মাছ ধরা পড়ত। স্থানীয় বাজারগুলো ছিল এ মাছের কদরে মুখর। এখন সেই চিত্র প্রায় হারিয়ে গেছে। নদীর বুক থেকে হারিয়ে যেতে বসেছে উত্তরাঞ্চলের মানুষের স্মৃতি, স্বাদ ও ঐতিহ্যের এক মূল্যবান অংশ ‘রুপালি’ বৈরালী মাছ।

মৎস্য বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, বৈরালী মাছ কমে যাওয়ার পেছনে চারটি প্রধান কারণ চিহ্নিত হয়েছে। এগুলো হলো অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যবহার, কারেন্ট জাল দিয়ে নির্বিচারে পোনা নিধন, মাছের অভয়াশ্রম থেকে মা মাছ শিকার এবং শুস্ক মৌসুমে নদ-নদীতে পানি না থাকা।

মৎস্য অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, বৈরালী মাছ চাষ করা যায় না। শুধু ব্রহ্মপুত্র, তিস্তা ও ধরলা নদীতে এ মাছ পাওয়া যায়। বেশি পরিমানে বৈরালী পাওয়া যায় তিস্তা নদীতে। কিন্তু সময়ের ব্যবধানে উত্তরাঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী এই মাছ এখন দিনদিন হারিয়ে যাচ্ছে। নদীতে আগের মতো আর বৈরালী মাছের ঝাঁক দেখা যায় না। প্রতি বছরই কমছে বৈরালী মাছের প্রজনন ও উৎপাদন।

জানুয়ারী থেকে মার্চ মাস পযর্ন্ত ব্রহ্মপুত্র, তিস্তা ও ধরলা নদী থেকে প্রতিদিন প্রায় চার কেজি কেজি বৈরালী পোনা শিকার করেন জেলেরা। স্থানীয় হাট-বাজারে এসব পোনা বৈরালী প্রতি কেজি ৪০০ থেকে ৪৫০ টাকায় বিক্রি হয়। অথচ এপ্রিল মাস পর্যন্ত পোনাগুলো নদ-নদীতে টিকে থাকতে পারলে সেগুলো পূর্ণাঙ্গ মাছ হিসেবে বড় হতো। এক কেজি বৈরালী পোনায় প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার থেকে ছয় হাজার পর্যন্ত পোনা থাকে।

লালমনিরহাট জেলা মৎস্য সম্প্রসারণ কর্মকর্তা সানজিদা ইয়াসমিন বলেন, এক কেজি বৈরালী মাছে পোনা এসব পোনা বড় হতে পারলে এপ্রিল-মে মাস নাগাদ মোট ওজন দাঁড়াতে পারত প্রায় চার মণ। জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত সময়কে বৈরালী মাছের প্রজনন ও বেড়ে ওঠার গুরুত্বপূর্ণ মৌসুম হিসেবে ধরা হয়। কিন্তু ঠিক এই সময়েই চলে সবচেয়ে বেশি পোনা নিধন।

তিনি বলেন, নদ-নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ও পরিবেশগত ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার কারণেও বৈরালী মাছের আবাস সংকুচিত হচ্ছে। নদীতে পানি কমে যাওয়া, নাব্যতা হ্রাস, দূষণ এবং নির্বিচারে নিষিদ্ধ জাল ব্যবহারের ফলে মাছের প্রজনন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

“ইলিশ রক্ষায় সরকারিভাবে বিভিন্ন কর্মসূচি থাকলেও বৈরালী মাছ সংরক্ষণে এখনো কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত জেলেরা যদি পোনা শিকার থেকে বিরত থাকেন, তাহলে বৈরালী মাছের প্রজনন উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো সম্ভব। একই সঙ্গে অন্যান্য দেশীয় মাছের সংখ্যাও বৃদ্ধি পাবে ‘ তিনি বলেন।

লালমনিরহাটের হাতীবান্ধা উপজেলার তিস্তা ব্যারেজ এলাকার জেলে নবীন চন্দ্র দাস বলেন, গেল বছর এই সময়ে প্রতিদিন গড়ে দুই কেজি বৈরালী মাছ ধরতেন তিস্তা নদীতে। এবছর দিনভর এককেজি মাছও মিলছে না। বর্তমান বাজারে প্রতিকেজি বৈরালী মাছ ৫০০ থেকে ৫৫০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।

’৫-৬ বছর আগে আমি একাই তিস্তা নদীতে ৪-৫ তেজি বৈরালী মাছ ধরতাম। প্রতিবছরই নদীতে বৈরালী মাছের প্রজনন কমে যাচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে আগামী কয়েক বছর পর তিস্তা নদীতে বৈরালী মাছ খুঁজে পাওয়া দুস্কর হবে,’তিনি বলেন।

তিনি বলেন, যারা পৈতৃকভাবে মৎস্যজীবি তারা কখনই পোনা ও মা মাছ শিকার করেন না। কিন্তু মৌসুমী মৎস্যজীবিদের কাছে পোনা ও মা মাছের কোন তফাত নেই। তারা কারেন্ট জাল দিয়ে নির্বিচারে পোনা মাছ ও মাছের অভয়াশ্রম থেকে মা মাছ শিকার করেন। ’এখন তিস্তা নদীরবুকে বিপুল পরিমানে ফসলের চাষাবাদ হয়। এতে মাত্রাতিরিক্ত রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহার করা হয়। এছাড়া শুস্ক মৌসুমে তিস্তা নদীর সবখানে পানির প্রবাহ থাকে না। সবমিলে বৈরালী মাছের বিচরণ ও প্রচনন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।

কুড়িগ্রামের চিলমারী উপজেলার ব্রহ্মপুত্র নদের তীরবর্তী জোড়গাছ মাঝিপাড়া গ্রামের জেলে অতুল চন্দ্র দাস বলেন, “ছয়-সাত বছর আগেও আমরা কারেন্ট জাল দিয়ে ব্রহ্মপুত্রে মাছ ধরতাম না। পরে কিছু মৌসুমি মাছ শিকারি এ জাল ব্যবহার শুরু করলে আমরাও বাধ্য হয়ে ব্যবহার করছি। আমরা জানি, এক পোয়া (২৫০ গ্রাম) বৈরালী পোনা মানে প্রায় এক মণ মাছের সমান। তারপরও জীবিকার তাগিদে পোনা ধরতে হয়।’

তিনি আরও বলেন,“নদ-নদী থেকে পোনা মাছ ও মা মাছ শিকার বন্ধকরতে হবে। এজন্য সরকারকে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। যাতে কেহই কারেন্ট জাল ব্যবহার করতে না পারে সেজন্য কঠোর হতে হবে। তবেই ব্রহ্মপুত্র নদে বৈরালী মাছের সুদিন ফিরে আসবে।’

লালমনিরহাট সদর উপজেলার তিস্তাপাড়ের কালমাটি মাঝিপাড়া গ্রামের জেলে সুভাষ চন্দ্র দাস বলেন, “তিস্তায় এখন আর আগের মতো মাছ নেই। জাল ফেললে সামান্য কিছু বৈরালী মাছ উঠছে। বৈরালী মাছের পোনা বড় হওয়ার সুযোগ পেলে তিস্তা নদীতে আবার বৈরালী মাছের প্রাচুর্য ফিরতো ‘বৈরালী মাছ আমাদের উত্তরাঞ্চলের রুপালি মাছ। কিন্তু চোখের সামনেই এই রুপালি মাছ হারিয়ে যাচ্ছে।”

রংপুর বিভাগীয় মৎস্য কর্মকর্তা আয়নাল হক বলেন, “কারেন্ট জাল দিয়ে নদীতে পোনা মাছ শিকারের বিরুদ্ধে স্থানীয় প্রশাসনের সহযোগিতায় অভিযান চালানো হলেও তা খুব বেশি কার্যকর হচ্ছে না। বৈরালী মাছ রক্ষা ও এর প্রজনন বৃদ্ধি এখন সময়ের দাবি।”

তিনি আরও বলেন,“এই মাছের বাজারচাহিদা ব্যাপক। ইলিশ মাছের মতো বৈরালী মাছ সংরক্ষণে সরকারিভাবে বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হলে তা বাস্তবায়নে মৎস্য বিভাগ কাজ করবে। এ ব্যাপারের সংশ্লিষ্ট উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পত্র দেওয়া হয়েছে।”


নিউজটি আপডেট করেছেন : Hasanuzzaman Hasan

কমেন্ট বক্স