সংস্কারের অভাবে নাজুক কর্ণফুলীর আব্দুল জলিল স্কুল মাঠ, চার দাবিতে খেলোয়াড়-ক্রীড়া সংগঠকরা
প্রকাশিত: 08:32 সকাল, 16 সেপ্ট 2026
মাঠ সংস্কার, বহিরাগত চলাচল বন্ধ, চারপাশে বাউন্ডারি নির্মাণ ও ঝুঁকিপূর্ণ গোলবার সংস্কারের দাবি
চট্টগ্রামের কর্ণফুলী উপজেলার আব্দুল জলিল বহুমুখী কৃষি উচ্চ বিদ্যালয়ের খেলার মাঠটি দীর্ঘদিন ধরে সংস্কারের অভাবে বেহাল হয়ে পড়েছে বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয় খেলোয়াড়, ক্রীড়ামোদী শিক্ষার্থী ও ক্রীড়া সংগঠকরা। বর্ষার পর মাঠের বিভিন্ন অংশে কাদা-পানি ও অসমতল পরিবেশ তৈরি হওয়ায় নিয়মিত অনুশীলন ও খেলাধুলা ব্যাহত হচ্ছে বলে জানিয়েছেন তারা।
মাঠটি শুধু বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের খেলাধুলার জন্য নয়, স্থানীয় বিভিন্ন ক্রীড়া সংগঠন ও সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগের নানা আয়োজনেও ব্যবহৃত হয়। শিকলবাহা স্পোর্টস একাডেমি, কর্ণফুলী মার্শাল আর্টসহ বিভিন্ন সংগঠনের খেলোয়াড়রা এখানে নিয়মিত অনুশীলন করেন। পাশাপাশি কর্ণফুলী আব্দুল জলিল চৌধুরী কলেজ ও আব্দুল জলিল বহুমুখী কৃষি উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের খেলাধুলারও অন্যতম প্রধান জায়গা এটি।
স্থানীয়দের ভাষ্য, চট্টগ্রাম জেলা ক্রীড়া অফিসসহ বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এই মাঠে ক্রীড়া আয়োজন ও মাদকবিরোধী বিভিন্ন কর্মসূচিরও আয়োজন করে থাকে। ফলে মাঠটি স্থানীয় ক্রীড়া চর্চার একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হলেও এর অবকাঠামো ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে নানা অভিযোগ রয়েছে।
মাঠের বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় খেলোয়াড় ও ক্রীড়া সংগঠকদের পক্ষ থেকে চারটি প্রধান দাবি জানানো হয়েছে। এগুলো হলো—মাঠ দ্রুত সংস্কার করা, মাঠে বহিরাগতদের অবাধ চলাচল বন্ধ করা, মাঠের চারপাশে বাউন্ডারি নির্মাণ এবং পূর্ব পাশে থাকা ঝুঁকিপূর্ণ গোলবারটি সংস্কার বা পরিবর্তন করা।
তাদের দাবি, মাঠ সংস্কারের পাশাপাশি স্থায়ীভাবে সীমানা নির্ধারণ ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা না হলে সংস্কারের সুফল দীর্ঘস্থায়ী হবে না। বিশেষ করে সন্ধ্যার পর মাঠে বহিরাগতদের প্রবেশের অভিযোগ থাকায় খেলোয়াড় ও শিক্ষার্থীদের নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে বাউন্ডারি নির্মাণ জরুরি বলে মনে করছেন তারা।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, প্রায় তিন বছর আগে তৎকালীন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মামুনুর রশিদ মাঠ সংস্কারের বিষয়ে বেশ কিছু উদ্যোগ নিয়েছিলেন। তবে সেই উদ্যোগের বড় একটি অংশ শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়িত হয়নি বলে দাবি স্থানীয় ক্রীড়া সংগঠকদের।
এদিকে গত বছর মাঠে কোরবানির পশুর হাট বসানোর পর মাঠের পরিবেশ আরও খারাপ হয়ে পড়ে বলে অভিযোগ রয়েছে। পরবর্তীতে সামান্য পরিমাণ বালি দিয়ে নামমাত্র সংস্কার করা হলেও তা মাঠের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের জন্য যথেষ্ট হয়নি বলে দাবি খেলোয়াড়দের।
তাদের ভাষ্য, প্রায় পাঁচ গাড়ি বালি ফেলে মাঠটি সাময়িকভাবে ব্যবহারের উপযোগী করার চেষ্টা করা হয়েছিল। কিন্তু স্থায়ীভাবে মাঠ সমতলকরণ, পানি নিষ্কাশন ও ঘাসসহ প্রয়োজনীয় সংস্কার না হওয়ায় বর্ষা এলেই আবার আগের অবস্থায় ফিরে যায়।
সাম্প্রতিক বর্ষার পর মাঠের বিভিন্ন স্থানে পানি জমে এবং কাদা তৈরি হওয়ায় খেলোয়াড়দের অনুশীলনে সমস্যা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। মাঠের কোথাও কোথাও মাটি অসমতল হয়ে থাকায় দৌড়ানো কিংবা ফুটবলসহ বিভিন্ন খেলায় অনুশীলন করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
খেলোয়াড়দের অভিযোগ, নিয়মিত অনুশীলনের জন্য একটি নিরাপদ ও সমতল মাঠ প্রয়োজন। কিন্তু বর্তমান অবস্থায় অনুশীলন করতে গিয়ে অনেক সময় খেলোয়াড়দের সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। মাঠের অবস্থা দ্রুত ঠিক করা না হলে স্থানীয় পর্যায়ে খেলোয়াড় তৈরির কার্যক্রমও বাধাগ্রস্ত হতে পারে বলে আশঙ্কা তাদের।
মাঠের পূর্ব পাশে থাকা একটি গোলবার নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন খেলোয়াড় ও ক্রীড়া সংগঠকরা। তাদের দাবি, গোলবারটির বর্তমান অবস্থা ঝুঁকিপূর্ণ। অনুশীলন বা খেলার সময় সেটি ব্যবহার করতে গিয়ে দুর্ঘটনার আশঙ্কা রয়েছে।
খেলোয়াড়দের মতে, মাঠ সংস্কারের পাশাপাশি পুরোনো ও ঝুঁকিপূর্ণ গোলবারটি দ্রুত পরীক্ষা করে প্রয়োজন হলে নতুন গোলবার স্থাপন করা জরুরি। কারণ খেলাধুলার মাঠে খেলোয়াড়দের নিরাপত্তার বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব পাওয়া উচিত।
মাঠটির চারপাশে পর্যাপ্ত সীমানা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা না থাকায় সন্ধ্যার পর বহিরাগতদের অনুপ্রবেশের অভিযোগও রয়েছে। স্থানীয়দের কেউ কেউ দাবি করেছেন, সন্ধ্যার পর অরক্ষিত মাঠে স্থানীয় কিছু বখাটে আড্ডা দেয়। সেখানে জুয়া ও মাদক সেবনের মতো কর্মকাণ্ডও হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
ক্রীড়া সংগঠকদের দাবি, মাঠে নিয়মিত খেলাধুলার পরিবেশ বজায় রাখতে হলে নির্দিষ্ট সময়ের বাইরে বহিরাগতদের প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। এজন্য মাঠের চারপাশে বাউন্ডারি নির্মাণের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় আলোকসজ্জা ও নজরদারি ব্যবস্থা গড়ে তোলার কথাও বলছেন তারা।
শিকলবাহা স্পোর্টস একাডেমির সহসভাপতি নুরুল ইসলাম মেম্বার বলেন, মাঠটি এলাকার ক্রীড়াবিদদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এখানে বিভিন্ন বয়সী খেলোয়াড় নিয়মিত অনুশীলন করেন। কিন্তু মাঠের বর্তমান অবস্থা অনুশীলনের জন্য যথেষ্ট নয়।
তিনি বলেন, মাঠটি দ্রুত সংস্কার করে খেলার উপযোগী করা দরকার। একই সঙ্গে বহিরাগতদের প্রবেশ বন্ধে মাঠের চারপাশে বাউন্ডারি নির্মাণ করা প্রয়োজন। পূর্ব পাশের ঝুঁকিপূর্ণ গোলবারটিও দ্রুত সংস্কার বা পরিবর্তন করার দাবি জানান তিনি।
শিকলবাহা স্পোর্টস একাডেমির প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক মো. ফরিদ বলেন, আব্দুল জলিল স্কুল মাঠটি শুধু বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মাঠ নয়; স্থানীয় অনেক ক্রীড়া সংগঠন এখানে নিয়মিত অনুশীলন ও বিভিন্ন কর্মসূচি পরিচালনা করে।
তার ভাষ্য, “এই মাঠে খেলোয়াড়রা নিয়মিত অনুশীলন করে। বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি ক্রীড়া আয়োজনও হয়। তাই মাঠটির উন্নয়ন হলে শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা নয়, পুরো এলাকার ক্রীড়াঙ্গন উপকৃত হবে।” তিনি মাঠ সংস্কারের পাশাপাশি স্থায়ী বাউন্ডারি নির্মাণ এবং বহিরাগতদের চলাচল নিয়ন্ত্রণের দাবি জানান।
চট্টগ্রাম জেলার রেফারি মুছা আদর্শ বলেন, একটি মাঠের মান ভালো না হলে খেলোয়াড়দের নিয়মিত অনুশীলন ব্যাহত হয়। মাঠ সমতল না থাকা এবং ঝুঁকিপূর্ণ সরঞ্জাম থাকলে খেলোয়াড়দের আঘাত পাওয়ার আশঙ্কাও থাকে।
তার মতে, মাঠের বর্তমান অবস্থা দ্রুত পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় সংস্কার করা উচিত। একই সঙ্গে মাঠে নিরাপদ খেলাধুলার পরিবেশ নিশ্চিত করার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিয়মিত নজরদারি প্রয়োজন।
চট্টগ্রাম বিভাগের খেলোয়াড় মো. জিসান বলেন, স্থানীয় পর্যায়ে প্রতিভাবান খেলোয়াড় তৈরি করতে নিয়মিত অনুশীলনের সুযোগ থাকা জরুরি। কিন্তু মাঠের অবস্থা খারাপ হলে খেলোয়াড়রা অনুশীলনে আগ্রহ হারাতে পারেন। তিনি মাঠটি দ্রুত সংস্কার, বাউন্ডারি নির্মাণ এবং ঝুঁকিপূর্ণ গোলবার অপসারণ বা সংস্কারের দাবি জানান।
মাঠ সংস্কারের বিষয়ে কর্ণফুলী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. রিদুয়ানুল ইসলাম বলেন, আব্দুল জলিল বহুমুখী কৃষি উচ্চ বিদ্যালয়ের মাঠটি সংস্কারের বিষয়টি প্রশাসনের নজরে রয়েছে।
তিনি জানান, মাঠ সংস্কারের বিষয়ে স্থানীয় সংসদ সদস্যের সঙ্গে ইতোমধ্যে আলোচনা হয়েছে। মাঠের বর্তমান পরিস্থিতি এবং প্রয়োজনীয় সংস্কারের বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়ে দ্রুত সময়ের মধ্যে ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা চলছে।
ইউএনও আরও বলেন, একটি খেলার মাঠ শুধু খেলাধুলার জায়গা নয়; শিশু-কিশোর ও তরুণদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশের সঙ্গেও এর সম্পর্ক রয়েছে। তাই মাঠটি যেন নিয়মিত খেলাধুলা ও অনুশীলনের উপযোগী থাকে, সে বিষয়ে প্রশাসন গুরুত্ব দিচ্ছে। প্রয়োজনীয় সংস্কারকাজ কীভাবে দ্রুত বাস্তবায়ন করা যায়, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে সমন্বয় করে পদক্ষেপ নেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, মাঠের সংস্কারের পাশাপাশি এর নিরাপত্তা ও ব্যবহার নিয়েও নজর দেওয়া প্রয়োজন। বহিরাগতদের অনিয়ন্ত্রিত চলাচল কিংবা মাঠের পরিবেশ নষ্ট হয়—এমন কোনো কর্মকাণ্ড থাকলে সেটিও খতিয়ে দেখা হবে। সংশ্লিষ্ট ক্রীড়া সংগঠন ও স্থানীয়দের সঙ্গে সমন্বয় করে মাঠটি একটি নিরাপদ ও ব্যবহারযোগ্য ক্রীড়া অবকাঠামো হিসেবে গড়ে তোলার বিষয়ে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে।
স্থানীয় খেলোয়াড় ও ক্রীড়া সংগঠকদের মতে, কর্ণফুলীতে নিয়মিত ক্রীড়া চর্চা ও নতুন খেলোয়াড় তৈরির জন্য আব্দুল জলিল স্কুল মাঠটির গুরুত্ব অনেক। কিন্তু দীর্ঘদিনের সংস্কার ঘাটতি, বর্ষায় মাঠের বেহাল অবস্থা, ঝুঁকিপূর্ণ গোলবার এবং নিরাপত্তার ঘাটতি খেলাধুলার পরিবেশকে বাধাগ্রস্ত করছে।
তাদের দাবি, শুধু সাময়িকভাবে বালি ফেলে মাঠ সংস্কার না করে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার আওতায় মাঠ সমতলকরণ, পানি নিষ্কাশন, প্রয়োজনীয় ঘাস রক্ষণাবেক্ষণ, নিরাপদ গোলবার স্থাপন এবং চারপাশে বাউন্ডারি নির্মাণ করা প্রয়োজন।
একই সঙ্গে সন্ধ্যার পর মাঠে বহিরাগতদের প্রবেশের অভিযোগ খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা। প্রশাসনের উদ্যোগ দ্রুত বাস্তবায়িত হলে মাঠটি আবারও কর্ণফুলীর খেলোয়াড় ও শিক্ষার্থীদের নিয়মিত অনুশীলনের প্রাণকেন্দ্র হয়ে উঠবে বলে আশা করছেন স্থানীয় ক্রীড়া সংশ্লিষ্টরা।