ইসলামী ব্যাংকে সংঘর্ষের প্রতিবাদে কর্ণফুলীতে চাকরিচ্যুত ব্যাংক কর্মকর্তাদের মহাসড়ক অবরোধ

প্রকাশিত: 08:55 সকাল, 14 সেপ্ট 2026

রাজধানীর মতিঝিলে ইসলামী ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে চাকরিচ্যুত কর্মকর্তা-কর্মচারী ও ‘ইসলামী ব্যাংক সচেতন গ্রাহক ফোরাম’-এর পাল্টাপাল্টি কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ ও ধাওয়ার ঘটনার প্রতিবাদে চট্টগ্রামের কর্ণফুলীতে মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছেন চাকরিচ্যুত ব্যাংক কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।

সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যা ৬টার দিকে কর্ণফুলী উপজেলার মইজ্জ্যারটেক এলাকার জিলানী গ্যাস স্টেশনের সামনে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের উভয় পাশে অবস্থান নিয়ে সড়ক অবরোধ শুরু করেন তারা। প্রায় দুই ঘণ্টা ধরে চলা এ অবরোধে চট্টগ্রাম দক্ষিণাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ এ মহাসড়কে যান চলাচল কার্যত স্থবির হয়ে পড়ে। এতে অসুস্থ রোগী বহনকারী অ্যাম্বুলেন্স, শ্রমিক পরিবহন, বাস, সিএনজি অটোরিকশা, মোটরসাইকেলসহ বিভিন্ন যানবাহনের যাত্রী ও সাধারণ মানুষ চরম দুর্ভোগে পড়েন।

ঢাকার ঘটনার প্রতিবাদে কর্ণফুলীতে কর্মসূচি

এর আগে সোমবার সকালে রাজধানীর মতিঝিলে ইসলামী ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে চাকরিচ্যুত কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং সচেতন গ্রাহক ফোরামের পাল্টাপাল্টি কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উভয় পক্ষের বেশ কয়েকজন আহত হওয়ার কথা বলা হয়েছে; তবে কে আগে হামলা করেছে, সে বিষয়ে দুই পক্ষের বক্তব্য পরস্পরবিরোধী।

চাকরিচ্যুত কর্মকর্তারা এস আলম গ্রুপের সময়ে নিয়োগ পাওয়া এবং পরবর্তীতে চাকরিচ্যুত হওয়ার পর পুনর্বহালের দাবি জানিয়ে কর্মসূচি পালন করছিলেন। অন্যদিকে সচেতন গ্রাহক ফোরাম ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে যোগ্য ও পেশাদার ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্তি এবং ব্যাংকে এস আলমের কথিত প্রভাবের প্রতিবাদে কর্মসূচি পালন করে।

সোমবারের সংঘর্ষে অর্ধশতাধিক মানুষ আহত হওয়ার দাবি বিভিন্ন প্রতিবেদনে এসেছে। আহতদের কয়েকজনকে হাসপাতালে নেওয়া হয়।

মইজ্জ্যারটেকে সড়ক অবরোধ

ঢাকার ওই ঘটনার প্রতিবাদে সন্ধ্যার পর কর্ণফুলীর মইজ্জ্যারটেকে জড়ো হন চাকরিচ্যুত ব্যাংক কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। তারা মহাসড়কের দুই পাশে অবস্থান নিয়ে সড়ক অবরোধ করেন এবং ঢাকার ঘটনার তীব্র প্রতিবাদ জানান।

আন্দোলনকারীরা চাকরি পুনর্বহালের দাবি জানান। একই সঙ্গে ঘটনার জন্য দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ দাবি করেন। এ সময় তাদের বিভিন্ন স্লোগান দিতে দেখা যায়। আন্দোলনকারীদের একটি অংশ জামায়াত-শিবিরবিরোধী স্লোগানও দেন।

অবরোধের কারণে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের দুই পাশে দীর্ঘ যানজট সৃষ্টি হয়। বিশেষ করে দক্ষিণ চট্টগ্রাম থেকে চট্টগ্রাম নগরী অভিমুখী এবং কক্সবাজারের দিকে চলাচলকারী যানবাহন আটকা পড়ে।

চরম ভোগান্তিতে সাধারণ মানুষ

অবরোধের কারণে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েন জরুরি কাজে বের হওয়া সাধারণ মানুষ। রোগী বহনকারী অ্যাম্বুলেন্স, কর্মস্থলমুখী শ্রমিক, বাসযাত্রী, সিএনজি অটোরিকশা ও মোটরসাইকেল চালকদের দীর্ঘ সময় সড়কে আটকে থাকতে হয়।

স্থানীয়দের অভিযোগ, গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়কে দীর্ঘ সময় ধরে অবস্থান কর্মসূচি চলায় জরুরি যানবাহনসহ সাধারণ মানুষের চলাচল ব্যাহত হয়। আন্দোলনকারীদের সঙ্গে যানবাহনের চালক ও সাধারণ মানুষের মধ্যে উত্তেজনাকর পরিস্থিতিও তৈরি হয় বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান।

আন্দোলন চলাকালে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ ঘটনাস্থলে উপস্থিত থেকে আন্দোলনকারীদের সড়ক ছেড়ে দেওয়ার জন্য বোঝানোর চেষ্টা করে। তবে দীর্ঘ সময় তারা অবস্থান অব্যাহত রাখেন।

এমপি এনামুল হকের আলোচনার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান

অবরোধ চলাকালে পটিয়া-চট্টগ্রাম-১২ আসনের সংসদ সদস্য এনামুল হক এনাম ঘটনাস্থলে পৌঁছান। তিনি আন্দোলনকারীদের সঙ্গে কথা বলেন এবং বিষয়টি আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের জন্য তাদের আলোচনার টেবিলে বসার প্রস্তাব দেন।

তবে আন্দোলনকারীরা ওই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে কর্মসূচি অব্যাহত রাখার ঘোষণা দেন। এ সময় পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে এবং আন্দোলনকারীদের একাংশ এমপি এনামের প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করেন বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান।

পুলিশের বিশেষ টিম পৌঁছানোর পর সড়ক ছাড়েন আন্দোলনকারীরা

পরে সন্ধ্যা পৌনে ৮টার দিকে পুলিশের একটি বিশেষ টিম ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ এবং মহাসড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক করার উদ্যোগ নেওয়া হলে আন্দোলনকারীরা ধীরে ধীরে সড়ক থেকে সরে যেতে শুরু করেন।

এরপর মহাসড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক করার প্রক্রিয়া শুরু হয়। তবে সড়ক ছাড়ার আগে আন্দোলনকারীরা দাবি আদায় না হলে ভবিষ্যতে আরও বৃহত্তর কর্মসূচিতে যাওয়ার হুঁশিয়ারি দেন।

চাকরি পুনর্বহাল নিয়ে নতুন করে উত্তেজনা

ইসলামী ব্যাংকের চাকরিচ্যুত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পুনর্বহালের দাবি নিয়ে গত কয়েকদিন ধরেই কর্মসূচি চলছে। রোববারও মতিঝিলে চাকরিচ্যুত কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং সচেতন গ্রাহক ফোরাম পাল্টাপাল্টি অবস্থান কর্মসূচি পালন করে। সেদিন কয়েক ঘণ্টা উত্তেজনাকর পরিস্থিতির পর উভয় পক্ষ স্থান ত্যাগ করেছিল।

সোমবার সেই উত্তেজনা সংঘর্ষে গড়ানোর পর এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে চট্টগ্রামেও। বিশেষ করে কর্ণফুলীর গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়ক অবরোধের ঘটনায় স্থানীয় জনজীবনে সাময়িক অচলাবস্থা তৈরি হয়।

চাকরিচ্যুত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দাবি, তাদের চাকরি পুনর্বহাল করতে হবে এবং তাদের ওপর হামলার ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করতে হবে। অন্যদিকে ইসলামী ব্যাংক সচেতন গ্রাহক ফোরামও নিজেদের দাবিতে অবস্থান করছে। ফলে বিষয়টি এখন শুধু চাকরি পুনর্বহালের দাবিতে সীমাবদ্ধ না থেকে ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা, পরিচালনা পর্ষদ এবং অতীত নিয়োগ ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে চলমান বিতর্কের সঙ্গেও যুক্ত হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকও ইসলামী ব্যাংকের জন্য গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিদের নিয়ে নতুন পরিচালনা পর্ষদ গঠনের বিষয়টি নজরে রাখছে বলে সোমবারের প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।