ভূয়া এনআইডি ও পাসপোর্ট ব্যবহারের অভিযোগে আদালতে শিমুল নাথ
প্রকাশিত: 01:33 দুপুর, 03 সেপ্ট 2026
পরিচয় বদলে, জাল কাগজপত্রে মামলা দায়ের ও প্রতারণার অভিযোগ
চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার পালেগ্রাম এলাকার বাসিন্দা শিমুল নাথ ওরফে তারণের বিরুদ্ধে বড় ভাইয়ের পরিচয় ব্যবহার করে জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি), পাসপোর্টসহ বিভিন্ন সরকারি নথি তৈরির অভিযোগ এনে চট্টগ্রাম মহানগর ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে একটি ফৌজদারি অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে। মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে, দীর্ঘদিন ধরে তিনি নিজের প্রকৃত পরিচয় গোপন রেখে বড় ভাইয়ের পরিচয় ব্যবহার করে বিভিন্ন প্রশাসনিক ও বিচারিক কার্যক্রম পরিচালনা করেছেন।
৩১ আগস্ট ২০২৬ তারিখে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে দায়ের হওয়া সিআর মামলা নং-২৭২২/২৬ (কোতোয়ালী)-এ বাদী যীশু নাথ মিল্টন অভিযোগ করেন, অভিযুক্ত শিমুল নাথ প্রকাশ তারণ দীর্ঘদিন ধরে তার যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী বড় ভাইয়ের পরিচয় ব্যবহার করে বিভিন্ন নথি তৈরি এবং আইনি কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছেন।
মামলার আরজিতে বলা হয়েছে, অভিযুক্ত ব্যক্তি বিভিন্ন সময় নিজেকে "পঙ্কজ নাথ" পরিচয়ে উপস্থাপন করেন। এই পরিচয় ব্যবহার করে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে অভিযোগ, আদালতে মামলা দায়ের এবং বিভিন্ন সরকারি নথি দাখিল করা হয়েছে বলে বাদীপক্ষের দাবি।
বাদীর অভিযোগ অনুযায়ী, গত ৪ আগস্ট ২০২৬ তারিখে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট (দক্ষিণ), চট্টগ্রাম আদালতে দায়ের হওয়া একটি মামলার নোটিশ পাওয়ার পর তিনি আদালত থেকে মামলার আরজি সংগ্রহ করেন। সেখানে মামলার আবেদনকারী হিসেবে "পঙ্কজ নাথ" নাম ও স্বাক্ষর দেখতে পান। এতে তার সন্দেহের সৃষ্টি হয়, কারণ তার দাবি অনুযায়ী প্রকৃত পঙ্কজ নাথ দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করছেন।
মামলায় আরও অভিযোগ করা হয়েছে, অভিযুক্ত শিমুল নাথ প্রকাশ তারণ তার বড় ভাইয়ের পরিচয় ব্যবহার করে জাতীয় পরিচয়পত্র, জন্মনিবন্ধন ও পাসপোর্ট তৈরির জন্য বিভিন্ন নথিতে অসত্য তথ্য ব্যবহার করেছেন। এসব নথি ব্যবহার করে আদালতসহ বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানে কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়েছে বলেও বাদীপক্ষের দাবি।
বাদীপক্ষ আরও জানিয়েছে, বিষয়টি জানার পর আইনজীবীর মাধ্যমে নির্বাচন কমিশনের আঞ্চলিক কার্যালয়, পাসপোর্ট অফিস, পুলিশ সুপারসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরে লিখিত অভিযোগ ও আইনি নোটিশ পাঠানো হয়েছে। অভিযোগে সংশ্লিষ্ট নথিপত্র, একাডেমিক সনদ, হলফনামা, ওয়ারিশ সনদ এবং অন্যান্য কাগজপত্র পর্যালোচনার আবেদন জানানো হয়েছে।
মামলার অভিযোগে বলা হয়েছে, অভিযুক্তদের পারিবারিক পরিচয় অনুযায়ী মৃত ডা. অমল কান্তি নাথ ও শেলী দেবীর চার ছেলে রয়েছেন। তারা হলেন পলাশ কান্তি নাথ, শিমুল কান্তি নাথ, সুমন কান্তি নাথ এবং জুয়েল কান্তি নাথ। স্থানীয়ভাবে সরেজমিন অনুসন্ধানে একই তথ্য পাওয়া যায়। এছাড়াও সুপরিচিত শিমুল কান্তি নাথ চট্টগ্রামে একটি জিম পরিচালনা করেন এবং পরিবারের অন্য তিন ভাই ও মা এবং তাদের পরিবার পরিজন দেশের বাইরে অবস্থান করছেন বলে বিবাদী বক্তব্য পাওয়া যায়।
বাদীপক্ষের দাবি, শিমুল নাথ ও তার বড় ভাইয়ের পরিচয় পরিবর্তনের মাধ্যমে বিভিন্ন সরকারি নথি তৈরি করা হয়েছে। তবে প্রতিবেদকের পক্ষে পলাশ কান্তি নাথের জাতীয় পরিচয়পত্র, পাসপোর্ট কিংবা সরকারি রেকর্ড স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। ফলে বড় ভাইয়ের প্রকৃত সরকারি পরিচয় সম্পর্কিত অভিযোগগুলো স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা যায়নি।
এছাড়া মামলার অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট ব্যাংক হিসাব, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের রেকর্ড, জন্মনিবন্ধন এবং নির্বাচন কমিশনে জমা দেওয়া নথিপত্র পরীক্ষা করলে প্রকৃত তথ্য বেরিয়ে আসতে পারে। তবে এসব তথ্যের সত্যতা যাচাইয়ের দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট তদন্তকারী সংস্থার।
চট্টগ্রামের একজন জ্যেষ্ঠ আইনজীবীর মতে, যদি তদন্তে প্রমাণিত হয় যে কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে অন্য ব্যক্তির পরিচয় ব্যবহার করে সরকারি নথি সংগ্রহ করেছেন কিংবা আদালতে সেই পরিচয় ব্যবহার করে মামলা করেছেন, তাহলে তা দণ্ডবিধির প্রতারণা, জালিয়াতি, মিথ্যা পরিচয় প্রদান এবং জাল নথি ব্যবহারের মতো একাধিক ফৌজদারি অপরাধের আওতায় আসতে পারে।
তিনি বলেন, অভিযোগপত্রে যেসব ধারা উল্লেখ করা হয়েছে, সেগুলোর প্রতিটি অভিযোগ আদালতে সাক্ষ্য, নথি এবং ফরেনসিক যাচাইয়ের মাধ্যমে প্রমাণ করতে হবে। শুধুমাত্র অভিযোগ দায়ের হওয়া মানেই অভিযুক্ত দোষী—এমনটি আইনের দৃষ্টিতে বলা যায় না। একইভাবে অভিযোগ অস্বীকার করলেই অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণিত হয় না। বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই প্রকৃত সত্য নির্ধারিত হবে।
আইন বিশেষজ্ঞ আরও বলেন, এ ধরনের মামলায় নির্বাচন কমিশনের তথ্য, জন্মনিবন্ধন, পাসপোর্টের আবেদনপত্র, শিক্ষাগত সনদ, আদালতে দাখিল করা হলফনামা এবং অন্যান্য সরকারি রেকর্ড অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আলামত হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
তদন্তে যেসব বিষয় যাচাই করা হতে পারে সেগুলোর মধ্যে রয়েছে— ১.অভিযুক্তের প্রকৃত জন্মনিবন্ধন ও জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য। ২. পাসপোর্ট তৈরির সময় জমা দেওয়া কাগজপত্র।৩. নির্বাচন কমিশনে দাখিল করা নথি। ৪. শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের এসএসসি রেজিস্ট্রেশন ও সনদ।৫. আদালতে দাখিল করা হলফনামা। ৬. ব্যাংক হিসাব খোলার সময় ব্যবহৃত পরিচয়পত্র।৭. বিদেশগমন সংক্রান্ত সরকারি রেকর্ড। ৮.সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরের সংরক্ষিত নথি।
এসব তথ্য যাচাইয়ের পরই অভিযোগের সত্যতা সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া সম্ভব হবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
এই প্রতিবেদন প্রকাশে শিমুল নাথ (ওরফে পঙ্কজ নাথ হিসেবে অভিযুক্ত) জানান, "২০০৫ সালে পাসপোর্ট করে প্রবাসে ছিলেন তিনি ও তার বড় ভাই। পরবর্তীতে সারা দেশে যখন এনআইডি করার বিষয় উঠে আসে তখন এনআইডি জন্য আবেদন করা হয় তখন দুই ভাইয়ের নাম ওলটপালট হয়ে যায়। পরবর্তীতে পরিবারের সকলের সম্মতিক্রমে তারা নাম পরিবর্তন করে। আমাদের কোন সরকারি চাকরি নেই। আমাদের সকল আয়ের উৎস প্রবাসী রেমিটেন্স। এবং আমি সরকারি ভাবে ক্রাইম করিনি। এটি ব্যাক্তিগত শত্রুতা। আমি ১৯৯৯৮ সালে এসএসসি পাস করিনি, উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাস করেছি তবে সালটি মনে নেই।"
বাদী যিশু নাথ মিল্টন দাবি, "বিবাদী তার ছোটবেলার স্কুল সাথী। প্রাইমারি থেকে হাই স্কুল একসাথে পার করেছে। এমনকি বাঁশখালী ডিগ্রি কলেজে এইচএসসি পরীক্ষাও দিয়েছে। তার বড় ভাই পলাশ কান্তি নাথ আমাদের সাথে এসএসসি পরীক্ষা দিলেও পেইল করায় উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাস করে। আমাদের স্কুল কলেজের একাধিক শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও প্রতিবেশীরা তা জানেন। সে যদি শিমুল নাথ হয়ে পঙ্কজ তবে সে একই জায়গায় দুইটা পরিচয় কেন বহন করছে?"
তথ্য তদন্তমূলক, পুলিশি বিশ্লেষণ ও আদালতের পর্যালোচনা নিয়ে পরবর্তী পর্ব প্রকাশিত হবে।