প্রশাসনের নজরদারির অভাবে দখল হচ্ছে রাউজানের শতবর্ষী ঈশা-খাঁ দিঘির পাড়

প্রকাশিত: 07:14 সকাল, 20 মে 2026


চট্টগ্রামের রাউজানের ১৫ নং নোয়াজিষপুর ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডে অবস্থিত শতবর্ষী ঐতিহাসিক জলাশয় ‘ইউছুপ দিঘি’ যা স্থানীয়দের কাছে ‘ঈশা খাঁ দিঘি’ নামেও পরিচিত। প্রায় ২৫ একরেরও বেশি আয়তনের এ ঐতিহাসিক দিঘিটি বর্তমানে জবরদখল, অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ ও পরিবেশ দূষণের কারণে অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।

স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, তৎকালীন ব্রিটিশ শাসনামলে ইউসুফ নামে এক বাদশা এ দিঘিটি খনন করেন। এছাড়া বারো ভূঁইয়ার অন্যতম শাসকের নামের সাথেও এ দিঘীর ইতিহাস জড়িয়ে থাকায় এটি ‘ঈশা খাঁ দিঘি’ নামেও পরিচিতি লাভ করে।

একসময় এ দিঘি এলাকাবাসীর সুপেয় পানির প্রধান উৎস ছিল। পাশাপাশি এটি ছিল সামাজিক ও ধর্মীয় কর্মকাণ্ডের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। দিঘিকে ঘিরে নানা লোককথা ও অলৌকিক ঘটনার কথা এখনো স্থানীয়দের মুখে মুখে প্রচলিত রয়েছে।

বর্তমানে দিঘিটির চারপাশে বিভিন্নভাবে জবরদখল চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে। দিঘির উত্তর, পূর্ব ও পশ্চিম পাড়ের একাধিক স্থানে দোকানপাট, বসতঘরসহ অন্যান্য স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছে। এতে দিঘির স্বাভাবিক পরিবেশ ও সৌন্দর্য নষ্ট হচ্ছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, দিঘির উত্তর-পশ্চিম পাড়ে দখল করে কয়েকটি দোকান নির্মাণ করা হয়েছে। এছাড়া পূর্ব পাড়ে গড়ে উঠেছে ব্যক্তিগত স্থাপনা।

স্থানীয়দের অভিযোগ, ধীরে ধীরে দিঘির পাড় ভরাট ও দখল করে স্থায়ী অবকাঠামো নির্মাণ করা হচ্ছে।

বর্তমানে দিঘিটি সরকারি খাস সম্পত্তি হিসেবে উপজেলা প্রশাসনের অধীনে রয়েছে এবং প্রতি বছর ইজারা দেওয়া হয়। স্থানীয় ব্যবসায়ী এসএম জাহেদুল আলম তিন বছরের জন্য দিঘিটির ইজারা নিয়েছেন। সরকারি নিয়ম অনুসারে গত ১ এপ্রিল ২০২৪ সালে সংশ্লিষ্ট ভূমি অফিস থেকে ঐতিহাসিক ইউছুপ দিঘি বৈধভাবে ইজারা নেওয়ার পর থেকে তিনি দিঘির রক্ষণাবেক্ষণ, নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ ও মাছ চাষ কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। মাছ চাষের দেখভালের জন্য তিনি একটি ঘর নির্মাণ করেছেন। পাশাপাশি সেখানে কয়েকটি গরুও লালনপালন করছেন।

বিষয়ে ইজারাদার এসএম জাহেদুল আলম বলেন, আমার বিরুদ্ধে একটি মহল উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়াচ্ছে। আমি সরকারি নিয়ম মেনে দিঘিটি ইজারা নিয়েছি এবং মাছ চাষসহ দিঘির রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব পালন করছি। মাছ চাষের তদারকি ও নিরাপত্তার স্বার্থে দিঘির পূর্ব পাশে একটি ছোট ঘর নির্মাণ করা করেছি। যেখানে কর্মচারীরা থাকেন। পাশাপাশি সীমিত আকারে কিছু গরু পালন করা হচ্ছে। কবরস্থান বা শ্মশানের জায়গা দখল কিংবা ধর্মীয় পরিবেশ নষ্ট করার অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, পশ্চিম উত্তর পাড়ে মোহাম্মদ আলী শিকদার নামের এক ব্যক্তি জবরদখল করে তিনটি দোকান নির্মাণ করেছেন। এছাড়াও কাশেম নামের এক ব্যক্তি দিঘির জলীয় অংশ দখল করে গার্ড ওয়াল নির্মাণ করেছেন।

এ বিষয়ে অভিযুক্ত কাশেম বলেন, আমি দিঘির কোনো জায়গা দখল করছি না। জানাজার মাঠ রক্ষার জন্য এলাকাবাসী মিলে দিঘির উত্তর পাড়ে ভাঙনরোধে গার্ড ওয়াল নির্মাণ করা হচ্ছে।

এ প্রসঙ্গে মোহাম্মদ আলী শিকদার বলেন, দোকান গুলো আমার না। আমার ভাই আলী আকবর সিকদারের। অনেকেই পাড় দখল করে বাড়িঘর ও গরুর খামার করেছে। হিন্দুদের শ্মশানের বাড়িঘর করেছে।

নোয়াজিষপুর ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান জিন্নাত আরা বেগম বলেন, দিঘির জলীয় অংশ ও পাড় দখলের বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়েছে। প্রশাসন প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে বলে আশা করছি।

স্থানীয় সচেতন মহল বলছেন, দ্রুত অবৈধ দখল উচ্ছেদ এবং ঐতিহাসিক দিঘিটি সংরক্ষণে প্রশাসনের কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে ভবিষ্যতে এ ঐতিহ্যবাহী জলাশয় পুরোপুরি দখল ও বিলুপ্তির ঝুঁকিতে পড়বে।

রাউজান উপজেলা সহকারী কমিশনার ভূমি অংছিং মারমা বলেন, ঐতিহাসিক ইউছুপ দিঘির জায়গা দখল ও অবৈধ স্থাপনা নির্মাণের বিষয়ে অভিযোগ পেয়েছি। বিষয়টি তদন্ত করে সরকারি জায়গা জবরদখলমুক্ত করতে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এসএম রাহাতুল ইসলাম বলেন, ইউছুপ দিঘি রাউজানের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের অংশ। দিঘির চতুর্পাড়ে অবৈধ দখল, স্থাপনা নির্মাণ কিংবা পরিবেশ দূষণের অভিযোগ গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। তদন্তকাজ চলমান আছে। তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা বলেন শতবর্ষী দিঘি সরকারি হলে উপজেলা নির্বাহী অফিসার সব স্থাপনা উচ্ছেদ করবে। জেলা প্রশাসন থেকে সব ধরনের আইনগত সহযোগিতা করা হবে।

নিউজ/ইনফো বাংলা/ আনিসুর রহমান/ রাউজান